শ্রীরামকৃষ্ণের 'আধ্যাত্মিক শক্তি''কে মেনেছিলেন ব্রাহ্ম রবীন্দ্রনাথ

চৈত্র মাসের কৃষ্ণা দশমী তিথি। ১৮৮৩ সালের ২ মে, বুধবার। কাশীশ্বর মিত্রের বাড়িতে ছিল নন্দনবাগান ব্রাহ্মসমাজের বিংশ সাংবাৎসরিক উৎসব। অনেক জ্ঞানীগুণীর সঙ্গে সেখানে আমন্ত্রিত যুবক রবীন্দ্রনাথ এবং যুগপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। 
রবি ঠাকুরের বয়স তখন ২২। আর শ্রীরামকৃষ্ণ ৪৭। প্রার্থনাসভার শুরুতে রবীন্দ্রনাথ পিয়ানো বাজিয়ে গান শোনালেন ঠাকুরকে। যুবক রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মসংগীত শুনে রামকৃষ্ণ ভাবোন্মোত্ত হলেন যেমনটা হতেন নরেনের গান শুনে। তারপর শ্রীরামকৃষ্ণ 
সেদিন সবার সঙ্গে লুচি, ডাল, মিষ্টি এসব খেয়ে দক্ষিণেশ্বর ফিরে যান। এই উৎসবের খবর প্রকাশিত হয় ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায়।

শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতে বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে যেভাবে, ” ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ নন্দনবাগান ব্রাহ্মসমাজ-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে বসিয়া আছেন। ব্রাহ্মভক্তদের সহিত কথা কহিতেছেন। সঙ্গে রাখাল, মাস্টার প্রভৃতি আছেন। বেলা পাঁচটা হইবে।
৺কাশীশ্বর মিত্রের বাগান বাড়ি নন্দনবাগানে। তিনি পূর্বে সদরওয়ালা ছিলেন। আদি ব্রাহ্মসমাজভুক্ত ব্রহ্মজ্ঞানী। তিনি নিজের বাড়িতেই দ্বিতলায় বৃহৎ প্রকোষ্ঠমধ্যে ঈশ্বরের উপাসনা করিতেন, আর ভক্তদের নিমন্ত্রণ করিয়া মাঝে মাঝে উৎসব করিতেন। 
তাঁহার স্বর্গরোহণের পর শ্রীনাথ, যজ্ঞনাথ প্রভৃতি তাঁহার পুত্রগণ কিছুদিন ওইরূপ উৎসব করিয়াছিলেন। তাঁহারাই ঠাকুরকে অতি যত্ন করিয়া নিমন্ত্রণ করিয়া আনিয়াছেন। ঠাকুর প্রথমে আসিয়া নিচে একটি বৈঠকখানাঘরে আসন গ্রহণ করিয়াছিলেন। সে 
ঘরে ব্রাহ্মভক্তগণ ক্রমে ক্রমে আসিয়া একত্রিত হইয়াছিলেন। শ্রীযুক্ত রবীন্দ্র (ঠাকুর) প্রভৃতি ঠাকুরবংশের ভক্তগণ এই উৎসবক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন।

আহূত হইয়া ঠাকুর ভক্তসঙ্গে দ্বিতলায় উপাসনামন্দিরে গিয়া উপবেশন করিলেন। উপাসনার গৃহের পূর্বধারে বেদী রচনা হইয়াছে। দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে একটি ইংরেজী বাদ্যযন্ত্র (Piano) রহিয়াছে।

পিয়ানো ও হারমোনিয়াম সংযোগে ব্রহ্মসঙ্গীত গীত হইতে লাগিল। সঙ্গীত শুনিয়া ঠাকুরের আনন্দের সীমা রহিল না।” কথামৃতকার সেদিনের ঘটনা প্রসঙ্গে আরও লিখছেন, “রাত নয়টা হইল। ঠাকুরের দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ফিরিয়া যাইতে হইবে। 
গৃহস্বামীরা আহূত সংসারীভক্তদের লইয়া খাতির করিতে করিতে এত ব্যতিব্যস্ত হইয়াছেন যে, ঠাকুরের আর কোন সংবাদ লইতে পারিতেছেন না।…..আহারান্তে ঠাকুর গাড়িতে উঠিলেন। গাড়িভাড়া কে দিবে? গৃহস্বামীদের দেখতেই পাওয়া যাচ্ছে না। 
ঠাকুর গাড়িভাড়া সম্বন্ধে ভক্তদের কাছে আনন্দ করিতে করিতে গল্প করিয়াছিলেন।”

শ্রী’মর ‘শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’ পড়ে জানা যায় সেকালের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিদের সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের আলাপ ছিল। ঠাকুর স্বয়ং নিজেই যেতেন অনেকের কাছে। শুধু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কাছেই না পুরনো কলকাতার অনেক সামাজিক সংগঠনেও 
তাঁর যাতায়াত ছিল। শ্রীরামকৃষ্ণের ব্রাহ্মসমাজেও যাতায়াত ছিল। একবার সেখানে শ্রীরামকৃষ্ণের যাওয়াকে কেন্দ্র করে গোলমালও বেধেছিল। এসব সত্ত্বেও ব্রাহ্মসমাজের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে রামকৃষ্ণের যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ ছিল। রবি ঠাকুরের 
পিতৃদেব দেবেন ঠাকুরের সাথেও শ্রীরামকৃষ্ণের আলাপ ছিল। একে অপরকে শ্রদ্ধা করতেন। দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে রামকৃষ্ণের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল ১৮৬৬ সালে, তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স ছিল মাত্র ৫ বছর।
শ্রীরামকৃষ্ণ নরেনের কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে ভালোবাসতেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য গানগুলি হল, ‘তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা’, ‘গগনের থালে রবিচন্দ্র-দীপক জ্বলে’, ‘আমার মাথা নত করে দাও’,’দিবানিশি করিয়া যতন’।

অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ, যিনি মনেপ্রাণে ছিলেন ব্রহ্মবাদী। নিরাকার ব্রহ্মের আরাধনা করতেন তিনিও একটা সময়ের পর মেনেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক শক্তিকে। আর তাই ১৯৩৪ সালে যখন রবি ঠাকুরের ‘মালঞ্চ’ উপন্যাস প্রকাশিত হল তখন 
দেখা গেল উপন্যাসের চরিত্র নীরজা শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্ত। যার বিছানার মাথার ওপরে টাঙানো রয়েছে পরমহংসদেবের ছবি। শুধু তাই নয়, শ্রীরামকৃষ্ণের কাছেই নীরজা আশ্রয় খোঁজে দিনরাত। দেবর রমেনের সঙ্গে আলাপের সময় নীরজাকে বলতে 
শোনা যায়, “যখন চোখের জল ভেতরে ভেতরে বুক ভেসে যায়, তখন ওই পরমহংসদেবের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকি।” নীরজা দুহাত জোড় করে ঠাকুরের ছবির দিকে তাকিয়ে বলে, “বল দাও ঠাকুর, বল দাও, মুক্তি দাও অধম নারীকে।”

রবি ঠাকুর মনেপ্রাণে ব্রাহ্ম হলেও স্বীকার করেছিলেন যুগপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণের শক্তিকে। আর ১৯৩৬ সালে শান্তিনিকেতনে বসে লিখেছিলেন ‘পরমহংস রামকৃষ্ণদেব’ নামে ১২ লাইনের একটি কবিতা। যার শেষ দু-ছত্র বড় চমৎকার, “দেশ বিদেশের 
প্রণাম আনিলে টানি /সেথায় আমার প্রণতি দিলাম আমি।” এই কবিতার ইংরেজি অনুবাদও করেছিলেন তিনি নিজে। এখানেই শেষ না, ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় শ্রীরামকৃষ্ণের প্রয়াণের দীর্ঘদিন পর কলকাতা ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে আয়োজিত 
একটি অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেছিলেন রবি ঠাকুর। সেই অনুষ্ঠানে তিনি একটি দীর্ঘ ভাষণ দিয়েছিলেন ইংরেজিতে। পরদিন আনন্দবাজার পত্রিকায় সেই ভাষণের বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়। যেখানে তিনি বলছেন, “পরমহংসদেবকে আমি ভক্তি করি। 
ধর্মনৈতিক ধ্বংসবাদের যুগে তিনি আমাদের আধ্যাত্মিক সম্পদ উপলব্ধি করে সেটির সত্যতা প্রমাণ করেছেন।”

তথ্যঋণ
শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত -শ্রীম
শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ -স্বামী সারদানন্দ
শ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথি- অক্ষয় কুমার সেন
আনন্দবাজার পত্রিকা আর্কাইভ