তালিবানের আতঙ্ক দূর হয়ে ক্রিকেট এখন কবুল 
ইডেন গার্ডেন্স দেখার পর অভিভূত হয়ে জানতে চান - এখানে এলে কি আইপিএলে মহেন্দ্র সিংহ ধোনি-কে সামনে থেকে দেখা
যায়? ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলতে কলকাতায় আসা অনূর্ধ্ব উনিশ আফগানিস্তান দলের ক্রিকেটারদের অবশ্য ইডেন দর্শন করে অভিভূত হয়ে পড়ারই কথা। কারণ,
সন্ত্রাসবিদ্ধ আফগানিস্তানে একটা দীর্ঘসময় পর্যন্ত তালিবানের রক্তচক্ষুর ভয়ে প্রকাশ্যে ক্রিকেট খেলাই যেত না। ইডেনের মতো বড়সড় স্টেডিয়াম দেখা তো দূরের
কথা। পাশাপাশি পরিকাঠামো সংক্রান্ত নানা সমস্যা তো ছিলই। সেসব প্রতিকূলতা জয় করে ক্রমশ এগিয়ে চলেছে আফগান ক্রিকেট। যে অগ্রগতির অংশ
হিসাবে শাপুর জাদ্রান-দের দেশের ছোটরা কলকাতায় অনূর্ধ্ব ১৯ ত্রিদেশীয় সিরিজে অংশ নিতে এসেছিলেন আফগানিস্তানের ক্রিকেটাররা। আফগানিস্তানে লোকচক্ষুর আড়াল থেকে সল্ট
লেকে যাদবপুর ক্যাম্পাসের মাঠে চারটি ম্যাচ খেলা - কতটা কঠিন ছিল এই যাত্রাপথ? মধ্য কলকাতার এক রেস্তোরাঁ-য় বসে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক
এক ক্রিকেটার পশতু (আফগান ভাষা) মিশ্রিত হিন্দিতে বললেন, ক্রিকেটের ঘোরতর বিরোধী ছিল তালিবান। তবু আমরা লুকিয়ে ক্রিকেট খেলতাম। গোপনে টেলিভিশনে
খেলা দেখতাম। কখনও তালিবানের হাতে ধরা পড়েননি? উত্তরে তিনি বললেন, একবার অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলাম। বাজার থেকে ফেরার সময়, তালিবানের
সামনে পড়ে গিয়েছিলাম। আমার নাম আমাকেই বলে ওরা জানতে চেয়েছিল, এই নামে কোনও ক্রিকেটার আমাদের গ্রামে থাকে কি না। আমি
বুদ্ধি খাটিয়ে অন্য গ্রামের ঠিকানা বলায় ওরা সেই গ্রামের দিকে রওনা দেয়, হাসতে হাসতে বলছিলেন ওই আফগান ক্রিকেটার। শুধু ক্রিকেটারদের
জন্যই নয়, খেলা দেখতে আসা দর্শকদের জন্যও ছিল তালিবানি নিষেধাজ্ঞা। আফগান দলের আর এক ক্রিকেটার বললেন, কেউ খেলা দেখতে গিয়েছে
জানলে, তার ওপরে অত্যাচার করত তালিবান। মহিলা দর্শকদের মারধর বা নির্যাতনও করা হতো। এ-ও জানালেন, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ পশ্চিম
আফগানিস্তানের পাখতিকা প্রদেশে একটি ক্রিকেট ম্যাচে বোমা বিস্ফোরণ করেছিল তালিবান। মারা গিয়েছিলেন ন'জন দর্শক। আহতের সংখ্যা ছিল পঞ্চাশেরও বেশি। কেন
ক্রিকেটের বিরোধিতা করত তালিবান? আফগানিস্তান দলের সঙ্গে গাইড হিসাবে কাবুল থেকে আসা দাউদ খান বললেন, ক্রিকেট খেলতে গেলে পশ্চিমী দুনিয়ার
পোশাক পরতে হয়। যা আফগান সংস্কৃতির বিরোধী বলে মনে করা হয়। পনেরো বছর আগে তালিবান ক্রিকেটের ওপর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফতোয়া
তুলে নিয়েছিল ওরা। কিন্তু বেশ কিছু অঞ্চলেই এখনও তালিবানের আপত্তি রয়েছে। আর যেখানে তালিবান বিরোধিতা নেই? দাউদ বললেন, সেখানে ছবিটা
অনেকটাই অন্যরকম। খোলাখুলি ম্যাচ হয়। তালিবান জঙ্গিরাও খেলা দেখতে আসে। পছন্দের দল জিতলে আকাশে গুলি করে আনন্দও প্রকাশ করে। দলের
এক মিডিয়াম পেসার বললেন, ক্রিকেট নিয়ে তালিবানের বিরোধিতার ছবিটা ক্রমশ পাল্টাচ্ছে। ২০১১-র মে মাসে ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর থেকেই
তালিবান শিবিরে ক্রিকেট নিয়ে মতদ্বৈতের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের একটা বড় অংশ মনে করছে, নাচ-গানের মতো বিনোদনের চেয়ে ক্রিকেট-ই বেশি রুচিসম্মত।
চাপ কমায় ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট 'সিক্সার লিগ' চালু হয়েছে। সিনিয়র দলও আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভাল খেলছে। তালিবানের ক্রিকেট-প্রেম নিয়ে মজার কাহিনি
শোনালেন আফগান দলের ম্যানেজার নাভিদ শায়ম। আফগানিস্তান 'এ' দলের প্রাক্তন অলরাউন্ডার বললেন, ২০১২-তে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি-তে বিশ্বকাপ যোগ্যতা অর্জন পর্বে
আমিই আফগান দলের ম্যানেজার ছিলাম। তখন দলের অধিনায়ক ছিল নওরোজ মোঙ্গল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে দেখছিলাম ওকে খুব চিন্তিত
দেখাচ্ছে। কী হয়েছে, প্রশ্ন করায় নওরোজ বলল, এক তালিবান নেতা ওকে ই-মেল করেছে। লিখেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হেরে গেলে আমরা
যেন দেশে না ফিরি। কারণ তোমাদের হার মানে আমাদেরও হার। দারুণ লড়াই করে সেই ম্যাচে জিতেছিলেন নওরোজরা। অনূর্ধ্ব ১৯ দলের
কোচ দৌলত খান আহমেদজাই বললেন, গত বিশ্বকাপে আফগানিস্তান স্কটল্যান্ডকে হারানোর পরে কাবুলের রাস্তায় দারুণ উৎসব করেছিল তালিবান। ক্রিকেট নিয়ে ওদের
এমন আনন্দ আগে কখনও দেখিনি। এর থেকেই বোঝা যায়, ওদেরও উৎসাহ বাড়ছে। কলকাতায় এসে রাহুল দ্রাবিড়ের মূল্যবান পরামর্শও পেয়েছে আফগান
দলের ক্রিকেটাররা। আসগর জাজাই, এহসান মোঙ্গল-দের শর্ট রান নেওয়ার দিকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ভারতীয় কিংবদন্তি। ক্রিকেট নিয়ে বিরোধিতা
ক্রমশ কমলেও এখনও রয়েছে পরিকাঠামোর সমস্যা। মহিলা দল তুলে দেওয়া হয়েছে প্রায় নিঃশদ্বে। কোচ দৌলত অবশ্য বলছেন, যা-ই সমস্যা
আসুক, আমরা বুক চিতিয়ে লড়ব। সমস্ত সমস্যা মিটে যাবে। দেখবেন, একদিন আইপিএলে আফগানিস্তানের ক্রিকেটাররাও খেলবে। 