হাজার বছরের স্কার্টেতিহাস 
স্কার্ট ব্যাপারটা কিঞ্চিৎ কমই হয়ে গিয়েছে ! আমেরিকার বাপের ভাগ্যি ভাল যে, ওটা বিকিনি নয় ! পার্সটাও খানিকটা মেঠো
হয়ে গিয়েছে ! ওটা স্মার্টফোন হলে আরও ভাল জমত ! জমত? হ্যাঁ, 'জমত'ই ! জমাতেই তো চেয়েছিলেন নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী
! ভারতের সভ্যতাকে একইসঙ্গে সাংঘাতিক 'আধুনিক' এবং ভয়ংকর 'প্রাচীন' প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর মোদী ওয়াশিংটনের ল্বেয়ার হাউসে বলে বসলেন - কোণার্কে
২০০০ বছরের পুরনো সূর্যমন্দিরের গায়ে খোদাই করা নারীমূর্তি আধুনিক যুগের মেয়েদের মতো কেতাদুরস্ত, স্কার্টপরিহিত। হাতে তাদের পার্স ! কী বলা
যায় একে? তথ্যভ্রান্তি? মোটেই না। এ হল ইতিহাস-নির্মাণ (বিনির্মাণে মোদী সম্ভবত বিশ্বাস রাখেন না। তা ছাড়া অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো কোণার্ক
দেখে বলেছিলেন, 'চিরযৌবনের হাট বসিয়াছে' ! মোদী সেই 'যৌবন'কেই প্রত্যক্ষ করেছেন মাত্র ! দোষের কী) ! বিকাশপুরুষ মোদী যদি ইতিহাসকে
নতুন করে বিকশিতই না-করতে পারেন, তবে তিনি কীসের 'বিকাশপুরুষ'? ত্রয়োদশ শতকে নরসিংহদেব কোণার্কের সূর্যমন্দির তৈরি করিয়ে ছিলেন - এ তথ্য
অতএব ইতিহাসের মলিন সালতামামি। আবুল ফজল এই মন্দিরের বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছিলেন। ষোড়শ শতকে শ্রীচৈতন্যদেব কোণার্কে গিয়েছিলেন। সপ্তদশ শতকে পুরীর রাজা
যখন মন্দির জরিপ করালেন, তখন কোণার্ক এক পরিত্যক্ত স্থাপত্যের দীর্ঘশ্বাস। এসব মোদীর জানার বা জানাবার প্রয়োজন নেই। তিনি সব এড়িয়ে
একটি দিকেই দৃষ্টিনিবদ্ধ করছেন। দেশের যা কিছু ঐতিহ্যশালী ও মহত্তম, তা শুধু হিন্দুত্বেরই ফসল আর সে ফসল মানবসভ্যতার ব্রাহ্মমুহূর্তের ঘণ্টাধ্বনির
মতো অবিকল্প, অমোঘ, অকৃত্রিম ! বলা যায় না, মোদী হয়তো কোনওদিন টপ-জিন্স পরিহিতা সীতাকে রামের সঙ্গে অযোধ্যার এসি মার্কেটেও পাঠিয়ে
দিলেন ! বললেন, রামায়ণের 'বিটুইন দ্য লাইনস' পাঠ করে তেমনই মনে হয়েছে তাঁর ! সঙ্গে টীকা দিলেন, রামায়ণের সময়কাল কী
বিশ্রীরকমের 'অ্যাডভান্স' ছিল ! রামায়ণের কবির কী দুর্দমনীয় কল্পনাশক্তি ছিল ! ভারতের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়েও 'মহামূল্যবান' মন্তব্য করেছেন মোদী। বলেছেন, ৭০০
বছর আগে ভারতে শল্যচিকিৎসা হতো। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস বেশিদিনের নয়। তবে আমার মনে আছে, ৭০০ বছরের পুরনো এক খোদাই করা মূর্তি
দেখেছিলাম। তাতে দেখানো হয়েছে, ওই নারীমূর্তির গর্ভে ভ্রূণ রয়েছে। মোদী অবশ্য বরাবর এরকম করেই ইতিহাসকে ভেঙে আবার নতুন করে তৈরি
করে নেন। তিনি আগেও বলেছেন, প্রাচীন ভারতে প্লাস্টিক সার্জারি করা হতো। অতীত ভারতের মহাকাশ গবেষণা প্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন, পুষ্পকরথে চড়ে ভারতীয়েরা
মহাকাশে পাড়ি জমিয়েছিলেন ! অবিশ্বাস্য সম্ভাব্যতার চেয়ে বিশ্বাসযোগ্য অসম্ভাব্যতাই বেশি গ্রহণযোগ্য। বলেছিলেন অ্যারিস্টটল। কাব্যতত্ত্বে। মোদী কথাটি তাঁর নিজের রাজনীতি-তত্ত্বে অবলীলায়
জুড়ে নিয়েছেন। তিনি জানেন, 'বিশ্বাসযোগ্য অসম্ভাব্যতা'র জন্য মুখিয়ে থাকেন মানুষ। সময়মতো শুধু সেসব 'প্লেস' করতে হয়। এর চেয়ে বড় সুড়সুড়ি
আর হয় না ! বিজেপি-প্রচারিত হিন্দুত্বের কুয়াশা-মাখা ধারণার ক্ষেত্রে এ-জাতীয় সুড়সুড়ির প্রভূত প্রয়োজন। মোদী সেটি জানেন। মোদী সম্ভবত এ-ও জানেন,
নিলস বোর বলেছিলেন, 'অপোজিট টু আ গ্রেট ট্রুথ ইজ অলসো আ ট্রুথ' ! মোদীকথিত, হিন্দুত্বখচিত 'সত্যে'র বিপরীতে আরও নানা সত্য
ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। সেখানে ইতিহাসের অন্যতর বিশ্লেষণ উঠে আসছে। ইতিহাস মূলত দু'ধরনের - 'রেকর্ডেড হিস্ট্রি' আর 'ডিপ হিস্ট্রি'। এবং 'রেকর্ডেড হিস্ট্রি'
সাধারণত গত ১০ হাজার বছরের ইতিহাস। কৃষি-আবিষ্কার থেকে যার শুরু। কিন্তু পেশাদার ঐতিহাসিকেরা অনেক ক্ষেত্রেই পাঁচ হাজার বছরের বেশি পিছনে
তাকাতে চান না। আর যে ইতিহাস ঐতিহাসিকের অর্থে 'রেকর্ডেড' নয়, অর্থাৎ, 'হোমো সেপিয়েন্স' হওয়া থেকে শুরু করে কৃষি-উদ্ভাবন পর্যন্ত অনথিবদ্ধ
যে ইতিহাস, সেটিই 'ডিপ হিস্ট্রি'। মোদী তো 'ডিপ হিস্ট্রি'র কথা বলছেন না ! সাল-তারিখ তুলে-তুলে নিশ্চিতভাবে 'রেকর্ডেড' ইতিহাসের কথাই বলছেন
! পাছে ভুল হয়ে যায়, এই ভয়ে ঐতিহাসিকেরা যখন মাত্র পাঁচ হাজার বছরের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণেই নিজেদের আবদ্ধ রাখতে চাইছেন, তখন
মোদী কীভাবে সেই প্রাজ্ঞ প্রহরার দরজা অবলীলায় ভেঙে ফেলতে উদ্যত হন? ১৮৯৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর ব্রুকলিনের এথিক্যাল সোসাইটির আমন্ত্রণে 'হিন্দুধর্ম'
শীর্ষক একটি ছোট্ট বক্তৃতায় স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, 'বেদ' কথাটা এসেছে 'বিদ' অর্থাৎ 'জানা' থেকে। মোদী 'হিন্দুধর্ম' নিয়ে তোলপাড় করছেন। কথায়-কথায়
বিবেকানন্দের 'রেফারেন্স'ও দিচ্ছেন। কিন্তু তিনি কি এই 'জানা'র অর্থকে নিজের কাছে পরিষ্কার করেছেন? লাহৌরেও হিন্দুধর্মের উপর একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন বিবেকানন্দ।
দীর্ঘ সেই বক্তব্যে অনেক কথার মধ্যে বলেছিলেন, 'মানুষের চিন্তাজগতে ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ মহত্তম অবদান - দর্শন এবং আধ্যাত্মিকতা।...জাতির কল্যাণে সর্বপ্রথম প্রয়োজন
দেশের সমস্ত আধ্যাত্মিক শক্তিকে খুঁজে বার করা।...বিক্ষিপ্ত আধ্যাত্মিক শক্তিগুলিকে একত্রিত করাই হল জাতির ঐক্য সৃষ্টি।' মোদী যদি তাঁর রাজনীতির মাধ্যমে
'হিন্দুত্ব'কেই ধরতে চান, তবে ধরার মতো করে ধরাটাই কাম্য। এভাবে ইতিহাস, স্থাপত্য, ধর্ম, বিজ্ঞানকে গুলিয়ে দিয়ে শেষপর্যন্ত দেশের ও দশের
কোন উপকারসাধনটি তিনি করছেন? এসব না-লাগছে হিন্দুত্বের 'হোমে', না-লাগছে রাজনীতির 'যজ্ঞে'! দূর থেকে অতীত চিনতে সকলে পারেন না। উৎপলকুমার
বসু 'পিয়া মন ভাবে' কাব্যে লিখেছিলেন - 'দিগন্তে এক মহানগরের মরীচিকা বাতাসে দুলছে - ওই সেই পাটলীপুত্র স্থান,
প্রেতভূমি দূর থেকে অতীত চিনেছি।' দেশের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি যেভাবে হরপ্পা সভ্যতা, কোণার্ক, চিকিৎসাবিদ্যা ইত্যাদিকে উপস্থাপন করছে, তাতে বাতাসে মরীচিকা দুলছে
বলেই মনে হচ্ছে। দূর থেকে অতীত চিনতে (এবং চেনাতে) গেলে তা অনেক সময়ই বাস্তবের সৌন্দর্যের বদলে প্রেতভূমির কদর্যতায় পর্যবসিত হয়
! তখন 'স্কার্ট' বা 'পার্সে'র মধ্যে নান্দনিকতা ধরা পড়ে না। আধুনিকতা স্পষ্ট হয় না। ইতিহাসও চোখে পড়ে না। চোখে পড়ে
শুধু নিজের দেশকে ভালভাবে না-জানার ঐতিহাসিক ব্যর্থতা ! 