টনসিল নিয়ে কিছু কথা
টনসিল কি?
উপসর্গের কারন
রোগের লক্ষণ
টনসিল প্রদাহের সমস্যা
সতর্কতা
ঘরোয়া সমাধান
টনসিল শব্দটির সাথে আমরা সকলেই কমবেশি পরিচিত। শব্দটি উচ্চারনের সাথে সাথেই মনে হয় গলার কোনো সমস্যা। সাধারণত গলার কোনো অসুখ শুনলেই টনসিলের কথাই প্রথমে মনে পড়ে। তবে সব ক্ষেত্রে গলা ব্যাথা মানেই টনসিল ভাবার কোনো কারন নেই। মানুষের শরীরের প্রতিটি অঙ্গই প্রয়োজনীয়। এবং সমস্ত অঙ্গগুলিরই বিভিন্ন কার্যকারিতা রয়েছে এবং প্রতিটি অঙ্গই সঠিকভাবে দেহকে পরিচালিত করে।

টনসিল কি?
টনসিল হলো এক ধরনের লসিকা গ্রন্থি যা জন্মের সময় থেকেই আমাদের দেহে অবস্থিত এবং এর অবস্থান গলদেশের দু’পাশে। জন্মের পর কিছুদিন একটু বড় থাকে, এরপর আস্তে আস্তে যখন বয়েস বাড়ে তখন ধীরে ধীরে এই গ্রন্থি ছোট হয়ে স্বাভাবিক হয়ে যায়।

টনসিল লসিকা গ্রন্থি বলে তার নিজস্ব কিছু প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে এবং নানা ভাবে মানব দেহকে রক্ষা করে। টনসিল দেহের এমন একটি মূল্যবান গ্রন্থি যেমন ঘরের দরজার পাশে মেশিনগান হাতে দাঁড়িয়ে থাকা পাহারারত দুই দেহরক্ষী। দেহরক্ষী থাকলে যেমন কোন শত্রু আক্রমণ করতে পারেনা, টনসিলও ঠিক এমনিভাবেই সর্বদা পাহারা দিয়ে আমাদের শরীরকে রক্ষা করে। তাই কোন রোগ বা জীবাণু আক্রমণ করলে তাকে প্রতিরোধ করে।

টনসিল শুনলেই মনে হয় গলাব্যাথা, সাথে জ্বর সর্দি কাশি, গ্ল্যান্ড ফুলে থাকার মতো নানা সমস্যা। আমাদের প্রায় প্রত্যেকের জীবনেই কমবেশি এই সমস্যা হয়েই থাকে। টনসিল দেহে শ্বেত রক্তকনিকা উৎপন্ন করে। এই শ্বেত রক্তকনিকা, বাইরে থেকে শরীরে প্রবেশ করা রোগজীবাণুর সাথে লড়াই করে। যখন শ্বেত রক্তকনিকা এই লড়াই করতে ব্যর্থ হয় তখনই বিভিন্ন রোগজীবাণু, ভাইরাস আক্রমণ করে রোগের সৃষ্টি করে। আবার অনেক ক্ষেত্রে রোগ জীবাণু ধ্বংস করতে গিয়ে নিজেই আক্রান্ত হয়ে পড়ে এবং নিজেই সংক্রামিত হয়। তখনই আমরা একে ‘টনসিলাইটিস’ বলি।

উপসর্গের কারন
‘টনসিলাইটিস’ সাধারণত হয়ে থাকে ঠাণ্ডা থেকে বা কোন ভাইরাসের আক্রমণে।
তবে কুড়ি থেকে পচিশ ভাগ টনসিলাইটিস-এর কারন হিসেবে লক্ষ্য করা গেছে নানা ধরনের ব্যাক্টেরিয়া যেমন স্ট্রেপ্টোকক্কাস কারনে। স্ট্রেপ্টোকক্কাস জীবাণুর আক্রমণে যে রোগ হয় তাকে বলে ‘স্টেপ্টো-থ্রোট’।
স্ট্যাফাইলোকক্কাস এবং বিটাহিমোলাইটিক, স্ট্রেপ্টোাক্কাস প্রভৃতি জীবাণুও এর কারন।
অ্যাপ্সটিনবার ভাইরাস, সাইটোমেগালো ভাইরাস, এডেনো ভাইরাস গুলিও এই রোগের কারন।
রোগের লক্ষণ
১) গলা ব্যাথা, জ্বর, স্রদি-কাশি।

২) দু-তিন দিনের বেশী গলা ব্যাথা এবং খাবার গিলতে অসুবিধা।

৩) মুখ হাঁ করলে দেখা যায়, লাল হয়ে ফুলে আছে দু’টো ছোট বলের মতো কিছু।

৪) মাঝে মাঝে মনে হয় গলা ফুলে পুঁজের মতো হয়েছে।

৫) গলার স্বর বা আওয়াজ পরিবর্তন হতে পারে।

৬) খাবারে অরুচি দেখা যায়।

৭) খাবার খেতে গলায় কষ্ট অনুভব হয়।

৮) গলায় ক্ষত, ঠাণ্ডা অনুভব, চোয়াল ও গলায় ব্যাথা ইত্যাদি।

৯) মাথাব্যাথা, কানে ব্যাথাও হয় মাঝে মাঝে।

টনসিল প্রদাহের সমস্যা
১) এর থেকে হতে পারে দীর্ঘস্থায়ি টনসিল প্রদাহ।

২) ঘটাতে পারে শ্বাসকষ্টের সমস্যা।

৩) নিদ্রা বা ঘুমের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

৪) খাবার খেতে অসুবিধা হয়।

৫) স্বরভঙ্গের জতিলতা দেখা যায়।

৬) কানের প্রদাহ এবং মাথাব্যাথার সমস্যা দেখা দেয়।

৭) হার্টের কপাটিকার রোগেরও লক্ষণও দেখা দিতে পারে।

৮) ফোঁড়া বা প্রদাহ হতে পারে।

৯) ব্যাক্টেরিয়াল এন্ডোকার্ডাইটিস।

১০) বাতজ্বর, স্পারলেট ফিডার ইত্যাদি।

সতর্কতা
টনসিল রোগের ক্ষেত্রে আমরা সবসময় একটু সতর্ক থাকলে বহুক্ষেত্রে রোগ সমস্যা থেকে রেহাই পেতে পারি। এজন্য কঠিন কিছু করতে হয়না। যেমন-

যেকোনো ঠাণ্ডা বিশেষ করে শীতকালে সতর্ক থাকা দরকার।
বরফ জল বা নানাধরনের শীতল, মিষ্টি পানীয়, কোল্ড ড্রিংক্স বা আইসক্রিম ইত্যাদি থেকে দূরে থাকতে হবে।
রোজ খাবার পর মুখ ধুতে হবে এবং কুল্কুচি করা প্রয়োজন।
সারাদিনে যতবার মুখ ধোঁয়া হয় ততবার কুল্কুচি বা গার্গেল করতে পারলে টনসিল সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। তবে এটা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করতে হবে।
প্রতিদিন দশ থেকে কুড়ি মিনিট প্রানায়ম উপকারি।
শিশুদের ছোট বয়স থেকে এই অভ্যাস গুলিতে অভ্যস্থ করতে হবে যাদের টনসিল আছে।
বহুক্ষেত্রে টনসিলের গায়ে সাদা বা হলদে প্যাঁচ দেখা যায়। সেক্ষেত্রে ভয় না পেয়ে নিয়মিত দশ থেকে বারো বার লবণ ও গরমজলে গার্গেল করলে উপকার পাওয়া যায়।
ঘরোয়া সমাধান
টনসিল হলে চিকিৎসকদের কাছে যাবার আগে অনেকে রোগ থেকে আরাম পাবার জন্যে কিছু পন্থা ঘরেই অবলম্বন করেন। প্রচলিত কথায় একেই বলে ঘরোয়া সমাধান। যেমন-

হালকা গরম জলে অল্প লবণ মিশিয়ে বারবার (দশ থেকে বারোবার) কুল্কুচি বা গার্গেল করতে হবে। এতে সংক্রমণ দূর হয়।
অল্প গরম জলে এক চামচ করে লেবুর রস ও মধুর সাথে এক চিমটি লবণ মিশিয়ে খেলে আরাম পাওয়া যায়। লবণ অ্যান্টিসেপ্টিকের কাজ করে। লেবুর রসে টক্সিন দূর হয় এবং মধু প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
গ্রিন-টি বা সবুজ চা দারুন কার্যকরী। এক চামচ সবুজ চাপাতা ও দেড় চামচ মধু ভালো করে মিশিয়ে অনেকক্ষন ফুটিয়ে পান করলে ভালো পাওয়া যায়। সবুজ চায়ের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান ও মধুর অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ক্ষমতায় আরাম লাভ হয়।
এক কাপ জলে সামান্য (তিন থেকে পাঁচ গ্রাম) আদাকুচি মিশিয়ে ভালো করে ফুটিয়ে নিয়ে পান করলে আরাম পাওয়া যায়।
এক্ষেত্রে এক কাপ গরুর দুধে সামান্য (পাঁচ গ্রাম) টাটকা হলুদ মিশিয়ে ভালো করে ফুটিয়ে তারপর গরম গরম খেলে আরাম হয়। দুধের অ্যান্টিবায়োটিক আর হলুদ টিস্যু প্রদাহ থেকে রক্ষা করে এবং এটা সংক্রমণ প্রতিরোধ করে।
 
