ইন্টারনেট ডিজঅর্ডার
আসক্তি 
কী ধরনের আসক্তি হয় তা এখানে বলা হয়েছে।

আসক্তির প্রভাব 
আসক্তি কী ভাবে বিপদ ডেকে আনতে পারে তা এখানে বোঝানো হয়েছে।

ইন্টারনেট ডিজঅর্ডার কী 
রোগটা কী তা এখানে বোঝানো হয়েছে।

প্রতিরোধ ও নিরাময় 
এই রোগ ঠেকানোর উপায় কী, নিরাময়ের পথই বা কী, তা এখানে বোঝানো হয়েছে।


প্রতিরোধ ও নিরাময়
এই কুপ্রভাবগুলোর বিষয়ে জানার পর স্বাভাবিক ভাবেই মনে প্রশ্ন জাগবে, কী ভাবে এর থেকে বেরনো সম্ভব ?

ইন্টারনেট আসক্তি থেকে নিজেকে মুক্ত করার কাজটা সত্যিই কঠিন। কারণ ইন্টারনেট বর্জিত জীবনযাপন আজকের দিনে অসম্ভব। তা হলে যেটা করতে হবে, তা হল, কী ভাবে ইন্টারনেটের যথাযথ ব্যবহার করতে হবে, তা শেখা। একেবারে বর্জন সহজ, কিন্তু বর্জন না করে নেশার বস্তুকে যথাযথ ব্যবহার করে, তার সুফল ভোগ করার কাজটা অনেকটাই কঠিন।

কিছু কিছু গবেষণায় দেখা যাচ্ছে কগনিটিভ বিহেভিয়ার থিয়োরি ইন্টারনেট আসক্তি দূর করার ক্ষেত্রে একটি প্রভাবশালী চিকিৎসা পদ্ধতি। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে ইন্টারনেটে আসক্ত মানুষটিকে শেখানো হয়, কী ভাবে প্রযুক্তি যথাযাথ ব্যবহার করা যেতে পারে এবং এই বিশেষ ব্যবহার কী করে সীমিত করা যেতে পারে। মোদ্দা কথা, নিয়ন্ত্রণ কী ভাবে করানো যেতে পারে তাই শেখানো হয়। এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে বিশেষ সুফল পাওয়া যাচ্ছে।

শেষে একটা কথা বলতেই হয়, অন্য সব রোগের মতোই সাবধানতা ও প্রতিরোধ সব সময়েই (দীর্ঘমেয়াদি ও অনেকাংশে অসফল) চিকিৎসার থেকে শ্রেয়। তাই বাবা মায়ের উচিত পরবর্তী প্রজন্মকে প্রযুক্তির যথার্থ ব্যবহার শেখানো। নির্দিষ্ট সময় ছাড়া অযথা ইন্টারনেট ব্যবহারের অভ্যাস যাতে না হয়, সেই শিক্ষা দিলেই আখেরে তাদের সন্তানদের ভাল করা হবে।

আসক্তি
আসক্তি এক বার ধরলে তার থেকে ছাড়া পাওয়া শক্ত। বিশেষ করে বলা হচ্ছে, অ্যালকোহল বা ড্রাগের আসক্তি থেকে মুক্তির তবু একটা পাকা না হোক, কাঁচা পথ আছে। কিন্তু ইন্টারনেট আসক্তির থেকে মুক্তির পথ নেই বললেই চলে।

২০১৩ সালে ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল অফ মেন্টাল ডিজঅর্ডার সংক্ষেপে ডিএসএম-এর পঞ্চম সংস্করণে বিভাগ তিনে ইন্টারনেট গেমিং ডিজঅর্ডারকে একটি বিশেষ সঙ্কটজনক অবস্থা বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর ওপর আরও গবেষণা ও পরীক্ষানিরীক্ষার কথা ভাবা হচ্ছে, যাতে পরবর্তীকালে এই ডিজঅর্ডারকে প্রধান ডিজঅর্ডারগুলোর তালিকাভুক্ত করা যায়।

লক্ষ্ করলে বুঝতে পারা যাবে অ্যালকোহল বা ড্রাগের নেশার মতো ইন্টারনেটের নেশারও একই বৈশিষ্ট্য।

১. প্রিঅকুপেসন -- একেবারে বুঁদ হয়ে যাওয়া।
২. উইথড্রয়াল সিম্পটমস -- নেশার বস্তু না পেলে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেওয়া, যেমন, রাগ, বিষাদগ্রস্ততা।
৩. টলারেন্স -- বারবার নেশার বস্তু পেতে চাওয়া এবং যত দিন যাবে তত বেশি ‘পরিমাণে’ বস্তুটি ব্যবহার।
৪. লস অফ আদার ইন্টারেস্ট -- অন্য কোনও কাজকর্ম করতে না চাওয়া।
৫. আনসাকসেসফুল অ্যাটেম্পটস টু কুইট -- নেশার বস্তু থেকে সরে আসার অপারগতা।
৬. ইমপ্রুভ ওর এসকেপ ডিসফোরিক মুড -- বিষাদগ্রস্ততার খপ্পর থেকে পালানোর উপায় হিসেবে নেশা করা।
৭. নেগেটিভ রিপারকাসনস -- বাজে তর্ক করার অভ্যাস, মিথ্যা কথা বলা, সমাজ থেকে পালানোর প্রবণতা।
তা হলে, এ কথা পরিষ্কার যে ইন্টানেটের অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের মধ্যে আনতে পারে আসক্তি। এ বার দেখা যাক আসক্তির প্রভাব কী হতে পারে।


ইন্টারনেট ডিজঅর্ডার কী
আধুনিক প্রযুক্তি আজ মানুষকে এক অন্য মাত্রার জীবন যাপন করার পথ দেখিয়েছে। পৃথিবীটা আজ গুটিয়ে চলে এসেছে মানুষের হাতের মুঠোয়। ‘মুঠো ফোন’ রূপে। বিভিন্ন অ্যাপস বন্যার জলের মতন মানুষের রোজকার জীবনে ঢুকে পড়ছে। আজ যা নতুন আগামিকালই তা ‘অবসোলিট’। “ এখন আর ফেসবুক করি না রে, ‘হোয়াটসঅ্যাপ’-এ তোকে মেসেজ করব”-- পথ চলতে চলতে এমন কথা কানে আসে। এখন সোশাল মিডিয়ার জমানা, স্কাইপি-তে আমেরিকাবাসী নাতি নাতনির অন্নপ্রাশন প্রত্যক্ষ করার জমানা। ইন্টারনেট নেটওয়ার্কিং জালের মতো মায়া বিস্তার করে গ্রাস করেছে আধুনিক মানুষের জীবন। প্রযুক্তির আশীর্বাদ চিরকালই তার সঙ্গে বয়ে এনেছে অভিশাপ। ইন্টারনেটও তার ব্যতিক্রম নয়। বিশেষত আজকের নতুন প্রজন্ম যারা যৌবনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছে বা যৌবনে প্রবেশ করেছে, সেই সব ছেলেমেয়ে খুব সহজেই ইন্টারনেট আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ছে। তার মধ্যে বিশেষত গেম খেলার আসক্তি ভীষণ ভাবে ক্ষতি করছে আমাদের তরুণ প্রজন্মের। ইন্টারনেট ও ইন্টারনেট-গেমিং-এর আসক্তি কাকে বলা হচ্ছে ? তার ফল ও প্রভাব কী ? এর প্রতিকারই বা কী ? এ সবই আমরা সংক্ষেপে আলোচনা করব এই বিভাগে।


আসক্তির প্রভাব
অরিত্র কলকাতার এক নামকরা স্কুলের প্রথম সারির ছাত্র। চিরকাল সে স্কুলে প্রথম নয় তো দ্বিতীয় হয়েছে। মাধ্যমিকে সে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম কুড়ির মধ্যে স্থান পেল। বাবা-মার কাছে আবদার করে সে বাড়িতে ইন্টারনেট কানেকশন নিল। কিন্তু কিছু দিন পর থেকে অরিত্রর আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্ করতে শুরু করলেন তার বাবা-মা। সে সব সময় দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘরে থাকছে। জিজ্ঞাসা করলে বলছে, ইন্টারনেটে পড়াশোনা করছে সে। তার খাওয়াদাওয়া অনিয়মিত হতে থাকল। বাবা-মা কাজ থেকে বাড়ি ফেরার পর তাদের সঙ্গে কথা বলতে চায় না, কোথাও যেতে চায় না। ঘন ঘন মেজাজ হারিয়ে খারাপ ব্যবহার করা শুরু করল। মুখে মুখে তর্ক করার অভ্যাস হয়ে গেল।

দু’বছর পর যখন উচ্চ মাধ্যমিকের ফল বেরলো তখন দেখা গেল সে তার বুদ্ধিবৃত্তি অনুযায়ী যথেষ্ট ভালো ফল করতে পারেনি। জানা গেল সে সব সময় ইন্টানেটে গেম খেলতো। অর্থাৎ ইন্টারনেট আসক্তির দীর্ঘমেয়াদি কুপ্রভাব অরিত্রর অ্যাকাডেমিক কেরিয়েরের উপর প্রতিফলিত হল। এক জন ভালো ছেলের এই অবনতি কেন হল? বিশেষত কমবয়সি ছেলেমেয়েরাই এই আসক্তির কবলে পড়ছে বেশি। কারণ তাদের মধ্যে প্রলোভনে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বয়স্ক মানুষদের তুলনায় বেশি।

এখন পর্যন্ত পাওয়া গবেষণার ফলাফল থেকে জানা যাচ্ছে (এশিয়ার কমবয়সি ছেলেমেয়েদের উপর বেশির ভাগ গবেষণা পত্র তৈরি হয়েছে) যখন মানুষ ইন্টারনেট বা ইন্টারনেট গেমে ডুবে থাকে তখন ড্রাগে আসক্ত মানুষ ড্রাগ নিলে মস্তিষ্কের যে অংশ যে পরিমাণ উত্তেজিত হয়, ঠিক সেই অংশ সেই একই পরিমাণে উত্তেজিত হয়। ইন্টারনেট আসক্তি একটা বিশেষ স্নায়বিক সাড়া তৈরি করে, যার প্রভাব অনুভূতির ওপর পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে ইন্টারনেট আসক্ত মানুষের মস্তিষ্কে বিশেষ পরিবর্তন ঘটে।

বিশেষত মস্তিষ্কে ও মস্তিষ্ক কোষের যে অংশগুলির দ্বারা মনোযোগ, অনুভূতি ও প্রক্ষোভ নিয়ন্ত্রিত হয়, সেগুলোর ওপর এই আসক্তির বিশেষ প্রভাব আছে। এই পরিবর্তন কোকেন বা হেরোইন আসক্ত মানুষের মস্তিষ্কেও দেখা দেয়। ডোপামিন আমাদের মস্তিষ্কে আনন্দ ও পুরস্কারপ্রাপ্তির অনুভূতি জাগায়- গবেষণায় দেখা গিয়েছে ইন্টারনেট আসক্ত মানুষের মস্তিষ্কের ডোপামিন গ্রাহকগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

