হাঁপানি রোগ নির্ণয়
কোনও বাচ্চার বারে বারে সোঁ সোঁ করে আওয়াজের ঘটনা ঘটলে, বিশেষত যদি তার পরিজনদের কারও হাঁপানি বা অ্যালার্জি আছে বলে জানা থাকে, তবে ডাক্তারবাবু বাচ্চার হাঁপানি থাকতে পারে বলে সন্দেহ করেন।
ডাক্তারবাবু সাধারণত এক্স-রে করতে বলেন এবং কখনও কখনও কারণ জানার জন্য অ্যালার্জি টেস্টও করান।
ঘন ঘন সোঁ সোঁ আওয়াজ করে এমন বাচ্চাদের অন্যান্য সমস্যা, যেমন সিস্টিক ফাইব্রোসিস বা গ্যাস্ট্রোইসোফিগাল রিফ্লাক্স ইত্যাদি আছে কিনা জানার জন্য পরীক্ষা করা হতে পারে।
বেশি বয়সের বাচ্চাদের অনেক সময় পালমোনারি ফাংশন টেস্ট (পিএফটি) করা হয়, যদিও বেশির ভাগ বাচ্চার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ির মাঝামাঝি সময়ে পালমোনারি ফাংশন স্বাভাবিক থাকে।
একটু বেশি বয়সের বা বয়ঃসন্ধির বাচ্চাদের যাদের হাঁপানি আছে, তারা প্রায়শই শ্বাসনালির বাধার পরিমাণ মাপার জন্য পিক ফ্লো মিটার (একটি ছোট যন্ত্র, যা কোনও ব্যক্তি কত জোরে ফুঁ দিতে পারে তা মাপতে পারে) ব্যবহার করে। ডাক্তাররা এবং বাবা-মায়েরা টানের সময়ে এবং দু’টি টানের মধ্যবর্তী সময়ে বাচ্চার অবস্থা বোঝার জন্য এই পরিমাপের সাহায্য নিতে পারেন। হাঁপানি আছে জানা থাকলে ডাক্তাররা এক্স-রে করান না, যদি না তিনি নিউমোনিয়া বা ফুসফুসের গণ্ডগোল সন্দেহ করেন।

ঝুঁকির বিষয়গুলি
কেন কিছু শিশুর হাঁপানি হয়, ডাক্তাররা পুরোপুরি তা বুঝে উঠতে পারেন না। কিন্তু তাঁরা কিছু ঝুঁকি চিহ্নিত করতে পেরেছেন।

কোনও বাচ্চার বাবা বা মায়ের হাঁপানি থাকলে তার হাঁপানি হওয়ার ঝুঁকি ২৫%। যদি বাবা ও মা দু’জনেরই হাঁপানি থাকে, তবে ঝুঁকি বেড়ে হয় ৫০%।
যে সব বাচ্চার মায়েরা গর্ভাবস্থায় ধূমপান করেছেন, সেই সব বাচ্চার হাঁপানি হওয়ার সম্ভবনা বেশি।
মায়েদের সম্পর্কিত কিছু বিষয়ের সঙ্গেও হাঁপানির যোগসূত্র আছে, যেমন কম বয়সে মা হওয়া, মায়ের পুষ্টির অভাব এবং স্তন্যপান না করানো।
সময়ের পূর্বে প্রসব এবং জন্মের সময়ে ওজনের স্বল্পতাও ঝুঁকির বিষয়।
শহুরে পরিবেশে থাকা বাচ্চাদের হাঁপানি হওয়ার সম্ভবনা বেশি, বিশেষত তারা যদি নিম্ন আর্থসামাজিক গোষ্ঠীভুক্ত হয়। যদিও বিষয়টি পুরোপুরি এ ভাবে বোঝা সম্ভব নয়। তবে মনে করা হয়, নিম্ন মানের বসবাসের পরিবেশের কারণে তারা হাঁপানির উদ্দীপকগুলির বেশি সংস্পর্শে আসে। সুচিকিৎসার অভাবও নিম্ন আয়ের মানুষের হাঁপানিতে আক্রান্ত হওয়ার অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
যে সব বাচ্চা অল্প বয়সে বেশি ঘনত্বের অ্যালারজেন যেমন ধূলিকণা বা আরশোলার মলের সংস্পর্শে আসে, তাদের হাঁপানি হওয়ার সম্ভবনা বেশি।
যে সব বাচ্চার কম বয়সে ব্রঙ্কোলাইটিস হয়েছে, পরবর্তীকালে ভাইরাল সংক্রমনে তাদের প্রায়শই সোঁ সোঁ করে আওয়াজ হয়। এই সোঁ সোঁ আওয়াজ প্রথমে হাঁপানি বলে মনে হতে পারে, কিন্তু অন্য বাচ্চাদের মতো এই বাচ্চাদের বয়ঃসন্ধিতে হাঁপানি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম।

প্রতিরোধ
অর্ধেক বা তার বেশি সংখ্যক বাচ্চাদের হাঁপানি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেরে যায়। যাদের ক্ষেত্রে রোগটি বাড়াবাড়ি রকমের আছে, বড় হওয়ার পরেও তাদের রোগটি থেকে যাওয়ারই সম্ভাবনা। রোগের প্রকোপ থেকে যাওয়ার এবং পুনরাবৃত্তি হওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলির মধ্যে আছে ধূমপান, কম বয়সে হাঁপানি হওয়া এবং বাড়ির ধূলিকণায় সংবেদনশীলতা।
বাচ্চাদের ক্ষেত্রে উদ্দীপক পদার্থ এড়াতে পারলে হাঁপানির বাড়াবাড়ি আটকানো যায়। অ্যালার্জি থাকা বাচ্চাদের অভিভাবককে সাধারণত পালকের বালিশ, কার্পেট, ঝালর লাগানো জামাকাপড়, ধুলোপড়া আসবাবপত্র, তুলো ভর্তি খেলনা এবং যে সব জায়গায় ধুলো হতে পারে সেগুলো বর্জন করতে পরামর্শ দেওয়া হয়।
যে বাচ্চার হাঁপানি আছে, পরোক্ষ ধূমপান প্রায়শই তার লক্ষণগুলি প্রকট করে তোলে। তাই যে এলাকায় শিশুটি সময় কাটায়, সেখানে ধূমপান করা বন্ধ করা দরকার। যদি কোনও একটি বিশেষ অ্যালারজেন এড়ানো সম্ভব না হয়, ডাক্তারবাবু অ্যালার্জি প্রতিরোধকারী ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে শিশুটির ওটির প্রতি সংবেদনশীলতা কম করাতে পারেন, যদিও হাঁপানিতে এর উপকারিতার কথা খুব একটা ভালো জানা নেই।
যে হেতু ব্যায়াম একটি বাচ্চার বিকাশের পক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, ডাক্তারবাবুরা সাধারণত বাচ্চাদের শারীরিক কাজকর্ম, শরীরচর্চা এবং খেলাধূলায় অংশগ্রহণ চালিয়ে যেতে উৎসাহ দেন এবং শরীরচর্চার আগে হাঁপানির ওষুধ ব্যবহারের নির্দেশ দেন।

চিকিৎসা
প্রচণ্ড রকম টানের ক্ষেত্রে চিকিৎসা হ’ল

শ্বাসনালী উন্মুক্তকরণ (ব্রঙ্কোডাইলেশন) এবং প্রদাহ বন্ধ করা

শ্বাসগ্রহণের সঙ্গে নেওয়া অনেক রকম ওষুধ শ্বাসনালি খুলে দেয়। বেশি বয়সের ও বয়ঃসন্ধির বাচ্চারা সাধারণত মিটার্ড-ডোজ ইনহেলার ব্যবহার করতে পারে। ৮ বছর বা তার কম বয়সি বাচ্চাদের সাধারণত স্পেসার লাগানো বা ধরে রাখার প্রকোষ্ঠযুক্ত ইনহেলার ব্যবহার করা সুবিধাজনক।
শিশু ও খুব কমবয়সি বাচ্চারা কখনও কখনও ইনহেলার ও স্পেসার ব্যবহার করতে পারে যদি শিশুর মাপের একটি মাস্ক তাতে লাগানো থাকে। যারা ইনহেলার ব্যবহার করতে পারে না তারা বাড়িতে নেবুলাইজারের সঙ্গে একটি মাস্ক লাগিয়ে তার মাধ্যমে এই ওষুধ গ্রহণ করতে পারে। নেবুলাইজার হ’ল একটি ছোট যন্ত্র যা উচ্চচাপে থাকা বাতাসের দ্বারা ওষুধের একটা ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে। ওষুধ শরীরে প্রবেশ করানোর জন্য ইনহেলার ও নেবুলাইজার দু’টিই খুব কার্যকর। ওষুধ মুখ দিয়ে খেয়েও নেওয়া যায়, যদিও টানার থেকে এই পদ্ধতি কম কার্যকর এবং সাধারণত শিশুরা, যাদের নেবুলাইজার থাকে না, তারাই এই পদ্ধতি ব্যবহার করে। যে সব বাচ্চার মাঝারি থেকে তীব্র টান হয়, তাদেরও কর্টিকোস্টেরয়েড মুখ দিয়ে খাওয়ানো হতে পারে।
যে সব বাচ্চার সাঙ্ঘাতিক টান হয়, তাদের হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে প্রথমেই অন্তত ২০ মিনিট ধরে নেবুলাইজার অথবা ইনহেলারের মধ্যে ব্রঙ্কোডাইলেটর দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। সাঙ্ঘাতিক টান ওঠা বাচ্চাদের যদি এই ওষুধ কাজ না করে, তবে অনেক সময় ডাক্তাররা এপিনেফ্রিন (একটি ব্রঙ্কোডাইলেটর) ইঞ্জেকশন দেন। ডাক্তাররা সাধারণত প্রচণ্ড টান ওঠা বাচ্চাদের শিরার মধ্যে দিয়ে কর্টিকোস্টেরয়েড ওষুধ দেন।
যে সব বাচ্চার হাল্কা, অল্পসল্প টান ওঠে, তারা সাধারণত কেবলমাত্র টানের সময়েই ওষুধ নেয়। যে সব বাচ্চার ঘন ঘন এবং সাঙ্ঘাতিক রকমের টান ওঠে তাদেরও ওষুধ নিতে হয়, এমনকী যখন টান থাকে না তখনও। টানের তীব্রতা এবং সংখ্যার ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হয়। যে সব বাচ্চার কখনওসখনও খুব অল্প টান ওঠে, তারা সাধারণত টান থেকে বাঁচার জন্য প্রতি দিন অল্প মাত্রার কর্টিকোস্টেরয়েড শুঁকে নেয়। যে সব রাসায়নিক পদার্থ নিঃসারিত হয়ে শ্বাসনালির প্রদাহ সৃষ্টি করে, এই সব ওষুধ ওই সব রাসায়নিক পদার্থ আটকে সেই প্রদাহ কমায়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওষুধের মাত্রা কমানো বাড়ানো হয় যাতে বাচ্চার হাঁপানির লক্ষণগুলিকে ঠিকঠাক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং সাঙ্ঘাতিক টান ঠেকানো যায়। যদি এই ওষুধগুলি সাঙ্ঘাতিক টান ঠেকাতে না পারে, তবে বাচ্চাকে কর্টিকোস্টেরয়েড মুখে খেতে হতে পারে। যে সব বাচ্চার ব্যায়াম করার সময়ে টান ওঠে, তারা সাধারণত ব্রঙ্কোডাইলেটরের একটি ডোজ ব্যায়াম করার ঠিক আগে টেনে নেয়।
যে হেতু হাঁপানি দীর্ঘস্থায়ী একটি অবস্থা এবং এর অনেক রকম চিকিৎসা হয়, ডাক্তাররা বাবা-মায়ের সঙ্গে এবং বাচ্চার সঙ্গে পরামর্শ করে নিশ্চিত হন যে কী ধরনের সমস্যা রয়েছে তা তাঁরা ঠিকঠাক বুঝেছেন।
বাবা-মা এবং ডাক্তারদের উচিত বিদ্যালয়ে শিক্ষক এবং অন্যদের বাচ্চার অবস্থা সম্পর্কে এবং কী ওষুধ দেওয়া হচ্ছে তা জানিয়ে রাখা। কিছু কিছু বাচ্চাকে বিদ্যালয়ে প্রয়োজনমতো ইনহেলার ব্যবহার করতে দেওয়া যেতে পারে এবং অন্যদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি বিদ্যালয়ের ডাক্তার দেখাশোনা করবেন।

