মৃত্যু কোনও লেখককে সত্যিই আবার জীবন্ত করে তুলতে পারে? 
স্টিফেন হকিং যেমন জনপ্রিয় বিজ্ঞানী ছিলেন, তেমনই কিন্তু জনপ্রিয় লেখকও ছিলেন। যে কারণে তাঁর লেখা 'দ্য থিওরি অফ এভরিথিং'
কিংবা 'আ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম'এর মতো বইগুলো এতটা জনপ্রিয়। কাজেই তাঁর লেখকসত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে লাভ নেই! প্রকাশিত হওয়ার
প্রথমদিকে যে আলোড়ন ফেলেছিল বইগুলো, বিক্রির যে রেকর্ড করেছিল, সেগুলো আবার আলোচনার কেন্দ্রে। স্টিফেন হকিংয়ের মৃত্যু বইগুলোর প্রতি মানুষের কৌতূহল
বাড়িয়ে তুলেছে। শুধু হকিংয়ের জনপ্রিয় বইগুলোই নয়, বিজ্ঞানীর লেখা যাবতীয় বই নিয়ে চর্চা চলছে। শুধু চর্চা নয়, অ্যামাজন-ফ্লিপকার্টের মতো ই-কমার্স
সাইটগুলোতেও হকিং প্রথমসারিতে উঠে এসেছেন রীতিমতো। এখানেই প্রশ্নটা ওঠে, তাহলে কি মৃত্যু কোনও লেখককে বাঁচিয়ে তুলতে পারে? রীতিমতো হটকেক বইমেলার
রেশ এখনও কাটিয়ে উঠেতে পারেননি পাঠককুল। এখনও কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে অমুক বইটা আছে, তমুক বইটা দিন না, এই বইটা কবে
পাব, নতুন সংস্করণ বেরোতে কত দেরি'র মতো প্রশ্নে জেরবার হচ্ছেন প্রকাশকেরা। কারণ অনেক বই-ই কিন্তু ওয়ার্ড অফ মাউথ পাবলিসিটির দৌলতে
প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। তার মধ্যে এমন বইও রয়েছে, যেগুলো লেখকের মৃত্যুর পর রীতিমতো হটকেক হয়ে উঠেছে। ছবি কিংবা পুরস্কার বিষয়টা
যে সাম্প্রতিক ট্রেন্ড, তা নয়। প্রকাশকরা এই ঘটনা আগেও দেখেছেন। এবং তাঁরা মনে করেন, মৃত লেখকের বই নিয়ে আগ্রহ সত্যিই
তৈরি হয়। 'আনন্দ পাবলিশার্স'এর সুবীর মিত্র যেমন বলছিলেন, এমনও দেখেছি, কোনও সংগীতশিল্পী মারা গেলে, তাঁর বইয়ের চাহিদা বেড়ে যায়। তাঁদের
চিঠি ইত্যাদিরও। তবে এই বিষয়টা যে খুব একটা স্থায়ী হয়, তা নয়! মৃত্যুর পর হয়তো তাৎক্ষণিক একটা চাহিদা তৈরি হয়।
কিন্তু সেটা ধীরে ধীরে কিছুদিন পর থেকেই স্তিমিত হতে শুরু করে। তবে কোনও বই থেকে ছবি হলে, কিংবা সেই বই
কোনও বড় পুরস্কার পেলে তার চাহিদা আবার বেড়ে যায়, জানালেন সুবীর। সুনীল, সুচিত্রা সুনীল, সুচিত্রা এ রকম ঘটনা মনে পড়ে,
যখন লেখকের মৃত্যুর পর তাঁর লেখা বইয়ের জন্য পাগলামি বেড়ে গিয়েছিল? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যখন চলে গেলেন, এ রকম হয়েছিল। এমনিতে
ওঁর বই সারা বছরই বিক্রি হয়। কিন্তু ওঁর মৃত্যুর পর, নানা রকমের ফোন আসতে শুরু করে। সুনীলের এই বইটা আছে,
ওই উপন্যাসটা আছে বলে। এ রকম ঘটনা সুচিত্রা ভট্টাচার্য মারা যাওয়ার পরও দেখেছি। ওঁর মিতিন মাসি কিংবা আরও উপন্যাস আছে
কি না জানার জন্য ফোনের পর ফোন, বললেন সুবীর। চাহিদা দিন সাতেকের বইমেলায় প্রয়াত লেখক রবিশংকর বল'এর উপন্যাস 'দোজখনামা' বিক্রি
হয়েছে প্রচুর। সেটা এখনও কমেনি। কী কারণে? আসলে কোনও লেখক মারা গেলে বিভিন্ন পত্রিকায়-সংবাদপত্রে তাঁকে নিয়ে লেখা হয়। চর্চা হয়।
রবিশংকর বল'এর 'দোজখনামা'র ক্ষেত্রে সম্প্রতি সেটা আরও বেশি লক্ষ্য করলাম। ওঁর অন্যান্য বইয়ের খোঁজও এখন করছেন পাঠকেরা। যেটা কিন্তু আগে
দেখিনি, বললেন 'দে'জ পাবলিকেশন'এর সুভাষ দে। কিন্তু তিনিও মনে করেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই চাহিদাটা দিন সাতেকের বেশি থাকে না।
কিছুদিন পরই সেটা থিতিয়ে পড়ে। মৃত্যুর পরও একই রকম সম্প্রতি বঙ্কিম পুরস্কার পেয়েছে আফসার আহমেদের উপন্যাস 'সেই নিখোঁজ মানুষটা'। সুভাষ
বললেন, পুরস্কার পাওয়ার জন্য বইটার বিক্রি বেড়ে গিয়েছে। কিংবা স্বপ্নময় চক্ত্রীর 'হলদে গোলাপ' আনন্দ পুরস্কার পাওয়ার পরও এটা লক্ষ্য করেছি।
তাঁর মতে, বই বিক্রি অনেকটাই বাড়িয়ে দেয় পুরস্কার এবং মৃত লেখকের পুরস্কারপ্রাপ্ত বইগুলোরও সেই কারণে চাহিদা বেড়ে যায়। নারায়ণ সান্যালের
মৃত্যুর আগে যত বই বিক্রি হতো, তাঁর মৃত্যুর পর সেটা বহু গুণ বেড়ে গিয়েছে। এবং ওঁর ক্ষেত্রেই দেখেছি, বই বিক্রি
একই রকম আছে মৃত্যুর পরও, বললেন সুভাষ। লেখা, আলোচনা 'পত্রভারতী'র ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় আবার বলছিলেন, কোনও লেখকের মৃত্যুর পর তাঁর বই
বিক্রির ট্রেন্ড মাস দুই-তিনেক থাকে। তাঁর মতে, মৃত্যুর পর মানুষ লেখক সম্পর্কে অনেক লেখা পড়েন, আলোচনা পড়েন। যে কারণে, তাঁর
লেখা, চিঠি কিংবা ছবির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় পাঠকদের মনে। তখন তাঁরা বইগুলোর খোঁজ করেন। তবে একমাত্র সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের যে
ক'টা বই আমাদের প্রকাশনা থেকে বেরিয়েছে, ওঁর মৃত্যুর আগে এবং পরে একই হারে বিক্রি হয়েছে। মৃত্যুর পর অনেকটাই বেশি, এটা
ঠিক। অনেকেই বলেন, সুনীলের বইয়ের বিক্রি কমে গিয়েছে। আমার তো একেবারেই তা মনে হয় না। আরেকটা উল্টো জিনিসও দেখেছি। মৃত্যুর
পর সৈয়দ মুজতবা সিরাজের বইয়ের বিক্রি কমে গিয়েছে, বললেন তিনি। রবিশংকর বল চাহিদাটা বেশিদিনের নয় প্রকাশকদের কথা না হয় শোনা
গেল। যাঁরা বই পাঠকদের হাতে পৌঁছে দেন, তাঁরা কী বলছেন? যখন ফ্লিপকার্ট বা অ্যামাজনের মতো সাইট ছিল না, তখন থেকেই
পাঠকদের কাছে বই পৌঁছে দিচ্ছেন তরুণ শ। প্রায় ৪০ বছর ধরে বই সরবরাহ করছেন তিনি। তরুণ বলছিলেন, এটা একেবারেই ঠিক
- কোনও লেখক মারা গেলে তাঁর বইয়ের বিক্রি বেড়ে যায়। কেউ নোবেল পেলে তাঁর বই পড়ার আগ্রহ বাড়ে। কোনও বই
থেকে ছবি হলেও বাড়ে। সম্প্রতি রবিশংকর বল'এর 'দোজখনামা'র সময়ও দেখলাম। লোকজন আমার কাছে চেয়ে পাঠিয়েছেন। তবে কী জানেন তো, এই
চাহিদাটা বেশি দিনের জন্য স্থায়ী হয় না। খুব বেশি হলে এক সপ্তাহ। তারপর আবার স্মিমিত হতে শুরু করে। যাঁরা সিরিয়াস
পাঠক, খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা কিন্তু নিজের মতো বইগুলো আনিয়ে নেন। কাজেই মৃত্যু কোনও লেখককে সত্যিই আবার জীবন্ত করে তুলতে পারে।
এটাই ট্রেন্ড। এবং হয়তো এই ট্রেন্ডই বার বার দেখা যাবে। 