কলকাতার মানুষ গান শুনতে নয়, গান খেতে আসেন! 
শরীর খারাপ নিয়েও কী গাইলেন! কলকাতার তো বেগম-জ্বর কাটছে না! (জোরে হাসি) ধন্যবাদ! ওয়েদার চেঞ্জের ফলে গলাটা বসে গিয়েছে।
ডাক্তার বললেন, যত রেস্ট দেবেন তত ভাল। কম কথা বলতে হবে। আর আমাদের গায়কীতে তো দাপট প্রয়োজন হয়। কণ্ঠ খুলে
গাইতে এনার্জি খরচ হয়। কনসার্টের সময়ে বুঝতে পারি না। বাড়ি ফিরলে ক্লান্তি চেপে বসে। তবু তো দর্শকের আবদার মেটালেন। সে
তো শোনাতেই হবে। দর্শক এত টাকা দিয়ে টিকিট কেটে গান শুনতে এসেছেন। আমাদের কাছে তাঁরাই ঈশ্বর। তাঁদের অনুরোধকে প্রাধান্য দেওয়াই
শিল্পীর কাজ। বোল দিয়ে অবলীলায় একের পর এক আলাপ গাইলেন! অনস্পট এটা তৈরি করে গাইতে পারি। এটাই আমার স্টাইল। গুরুর
কাছে তো সকলে গান শেখেন। কিন্তু কোথাও তো একটা নিজস্বতা রাখতে হবে। না হলে নিজেকে ফাঁকি দেওয়া হয়। এ তো
দারুণ প্র্যাকটিস আর অধ্যবসায়ের কাজ! ভীষণ! প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর এই ফিল্ডে রয়েছি। ন'বছর বয়স থেকে গান করছি। পৃথিবীতে হেন কোনও
মিউজিক ফেস্টিভ্যাল নেই, যেখানে গাইনি। অভিজ্ঞতার তো একটা দাম থাকেই। কলকাতার মঞ্চে ক্রমাগত গানের অনুরোধ আসছিল। বিরক্ত হচ্ছিলেন? গায়কের অ্যাটিটিউড
দেখানোর কোনও জায়গা নেই। একগুঁয়েমিতে যা ভাবছি, তাই গাইব - দিস ইজ নট অ্যাকসেপ্টেবল। আর কলকাতার যত তারিফ করব, ততই
কম। এই শহর শাস্ত্রীয় সংগীতের কেন্দ্রস্থল। পশ্চিমবঙ্গ আর মহারাষ্ট্রেই এই ব্যাপারটা পাওয়া যায়। কলকাতার মানুষ গান শুনতে নয়, গান খেতে
আসেন! কোনও ভুল হলে ক্ষমা করবেন' - অনুষ্ঠান শুরুর আগে সাধারণ শ্রোতাদের উদ্দেশে বলছেন শাস্ত্রীয়সংগীতের অন্যতম স্তম্ভ! এ কি শুধুই
বিনয়, নাকি সংগীত-ঘরানার চিরায়ত শিক্ষা? এটা আমার গুরুর শিক্ষা, মা-বাবার শিক্ষা। প্রত্যেকটা কনসার্টই আমার কাছে এক-একটা চ্যালেঞ্জ। কী করব, দু'দিন
আগে থেকে সেটা যেন ক্যানভাসে পেন্ট করে নিই। ভুল-ত্রুটি হলে ক্ষমা তো চাইতেই হবে। শিল্পীরা তো কোনও বিশেষ সংস্থা বা
মন্ত্রীদের খুশি করতে গান না। সাধারণের জন্য গান। 'ছোটবেলা' শদ্বটা বললেই কী মনে পড়ে? একটা ছ'বছরের মেয়েকে টানা বসিয়ে রেখে
রেওয়াজ করানো হচ্ছে আর তার বন্ধুরা বাইরে খেলতে যাচ্ছে! আমাদের সময় তো টিভি ছিল না। যেটুকু সময় পেতাম, বাইরেই খেলতাম।
বাবা বলতেন - 'মা, চারটে বাজে। এবার রেওয়াজে চলো।' আপনার প্রথম শিক্ষাগুরু তো বাবা। শোনা যায়, তাঁর সম্পর্কে ছোটবেলায় আপনার
ফিডব্যাক নাকি ভাল ছিল না! কড়া ছিলেন বলে? (হাসতে হাসতে) ওই সময় বাবার কথা শুনেছিলাম বলে আজ এখানে আসতে পেরেছি।
আমার আগে এত বড় বড় গুণীজন বসে রয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে এক সারিতে বসে গাওয়ার সুযোগ পাওয়া চাট্টিখানি কথা? সারাদিন রেওয়াজ
করাতেন? অনেকে মিথ্যা কথা বলেন যে, আট ঘণ্টা বা দশ ঘণ্টা করে রেওয়াজ করেন। আরে বাবা, কিঁউ ঝুট বোলতে হো!
মেডিক্যালি ইট ইজ নট পসিল্ব! এক ঘণ্টা রেওয়াজ করতাম তো আধ ঘণ্টা রেস্ট নিতাম। পুরোদিনে খুব কষ্ট করে চার থেকে
পাঁচ ঘণ্টা! এর চেয়ে বেশি রেওয়াজ করলে গলা ড্যামেজ হওয়ার চান্স থাকে। ভোকাল কর্ড খুব সংবেদনশীল। এতটাই আবেগপ্রবণ যে, মনে
আঘাত পেলে, খারাপ খবর পেলে মুহূর্তে আক্রান্ত হতে পারে। ঠিকমতো ট্রেনিং নিয়ে একে শক্ত বানাতে হয়। বাবা-ই এসব শিখিয়েছিলেন। এত
জায়গা থাকতে কলকাতায় গান শিখতে এলেন কেন? বাবা আমায় কোনও উস্তাদ বা পণ্ডিতের হাতে দিতে চাননি। শুধু দেখতে চাইতেন, সেই
গুরুর কাছে তাঁর মেয়েকে দেওয়ার মতো কতটা শিক্ষা রয়েছে। কলকাতায় হেন কোনও সংগীতব্যক্তিত্ব ছিলেন না, যাঁর সঙ্গে বাবার পরিচয় ছিল
না। এ টি কানন বাবার খুব ভাল বন্ধু ছিলেন। তিনিই চিন্ময় লাহিড়ীর কাছে নিয়ে যান। আমার তখন পাঁচ বছর। চিন্ময়জেঠু
আমায় কোলে বসিয়ে বললেন, 'মা, তুমি একটু গাও তো।' গাওয়ার পর বাবাকে বলেছিলেন, 'আপনি তো মেয়েকে তৈরি করেই এনেছেন! ওর
ভগবানদত্ত গলা!' বাবা তখন বলেছিলেন, 'ভগবান ওকে প্রতিভা দিয়েছেন, কিন্তু তা উৎকর্ষে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আপনার।' সে-ই শুরু। গুরুভাগ্য ভাল
ছিল বলেই এই জায়গায় আসতে পেরেছেন, এমন কখনও মনে হয়? আমার জীবনে মোট তিনজন গুরু। তাঁদের যত প্রশংসা করি, ততই
কম। এখনকার গুরুরা অনেক বেশি মতলবি! কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করছি না। তবে তখনকার শেখানো অন্যরকম ছিল। শিক্ষার্থী ভাল হলে গুরু
জানপ্রাণ লড়িয়ে দিতেন। চিন্ময়জেঠু তেমনই ছিলেন। অসম থেকে কলকাতা। সংগীতশিক্ষার যাত্রাপথের দূরত্বটা তো কিছু কম ছিল না। স্কুল-বাড়ি-গান-রেওয়াজ ম্যানেজ করতেন
কী করে? কনভেন্টে পড়তাম। শুক্রবার স্কুল ছুটি নিয়ে কলকাতায় আসতাম। দু'দিন গান শিখে রবিবারের ফ্লাইটে ফিরে যেতাম। তখনকার দিনে কী
বাজে ফ্লাইট! কাকের মতো যেত! আমি তো প্রায় আধমরা হয়ে যেতাম! এর পর তো যিনি গুরুর স্থানে এলেন, তিনি জীবনে
রয়েই গেলেন! হ্যাঁ, বর্তমানে তিনি আমার স্বামী - উস্তাদ দিলশাদ খান। উনি আমাদের প্রথমদিন মাড়ওয়া গেয়ে শুনিয়েছিলেন। সে গান শুনে
তো আমরা মুগ্ধ! ওখান থেকেই পাতিয়ালা ঘরানা থেকে কিরানা ঘরানায় আসি আমি। বেগম পরভিন সুলতানার জীবনের বাকিটা তো ইতিহাস! মাত্র
২৬ বছর বয়সে 'পদ্মশ্রী'! সংগীতই আমাদের কাছাকাছি এনেছে। দুনিয়া একদিকে চলে যায়, ওঁর কাছে গানবাজনা অন্যদিকে। আমায় বলতেন, 'তুমি ভাল
করে রেওয়াজ করবে, না হলে আমি খাব না!' এ রকম ক'জন স্বামী পাওয়া যায়, বলুন! গান ছাড়া দ্বিতীয় শখ কী?
রান্না! বাড়িতে ডেকে নিজে রেঁধে লোক খাওয়াতে খুব ভালবাসি। আল্লা রাখা খান সাহাবও এসেছেন। আর অপূর্ণ স্বপ্ন? জীবনে যদি ২০
ফুট উচ্চতা অতিক্রম করা লক্ষ্য হয়ে থাকে, তাহলে এতদিনে মাত্র সতেরোয় এসে পৌঁছেছি। বাকিটা এখনও চেষ্টা করে চলেছি। 